মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার অন্যতম প্রধান ক্যান্সার হিসেবে বিবেচিত। তবে রোগটি যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায় এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হয়, তাহলে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক শনাক্তকরণের উপর গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। এই ব্লগ-এ, আমরা স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ, স্তন ক্যান্সার কীভাবে শনাক্ত করা হয় (বিভিন্ন স্ক্রিনিং পদ্ধতি), এবং কখন আপনার এই পরীক্ষা করানো উচিত, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনাকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
Synopsis
স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক উপসর্গ
প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সারের কোনও সুস্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে, সতর্কতামূলক কয়েকটি সূক্ষ্ম লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ সম্পর্কে সচেতনতা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। এই সাধারণ লক্ষণগুলি হতে পারে:
১. স্তনে বা বগলের কাছে নতুন কোনও ফোলাভাব অথবা গাঁট বা শক্ত অংশ অনুভব হওয়া
২. স্তনের আকার, আকৃতি বা চেহারাতে পরিবর্তন দেখা দেওয়া
৩. স্তনের ত্বক লালচে বা খসখসে হয়ে হওয়া
৪. স্তনের ত্বক কমলালেবুর খোসার মতো হয়ে যাওয়া
৫. স্তনের ত্বকে গর্ত সৃষ্টি হওয়া
৬. নিপল ভিতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা অবস্থান পরিবর্তন হওয়া
৭. নিপল থেকে রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল বের হওয়া
৮. স্তনে বা নিপলে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব হওয়া
৯. বগলের লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
১০. স্তনের ত্বকে চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা ঘা হওয়া

স্ব-পরীক্ষা: কখন এবং কিভাবে করবেন
প্রতি মাসে আপনার মাসিক চক্রের ৭-১০ দিন পর একবার স্তনের স্ব-পরীক্ষা করুন। মেনোপজ-এর পর মাসের একটি নির্দিষ্ট দিন বেছে নিন এবং প্রতি মাসে একই দিনে স্ব-পরীক্ষা করুন। যদি আপনি উপরোক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে কোনওটি লক্ষ্য করেন, তবে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত
চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্তন ক্যান্সার পরীক্ষা করিয়ে নিন। এগুলি ক্যান্সার ছাড়াও অন্যান্য নানাবিধ কারণে হতে পারে।
-
ধাপ ১- আয়নার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ান।
-
ধাপ ২- স্তনের আকার, আকৃতি বা ত্বকে কোনও পরিবর্তন আছে কি না দেখুন।
-
ধাপ ৩- দুই হাত উপরে তুলে আবারও স্তন পর্যবেক্ষণ করুন।
-
ধাপ ৪- নিপল-এ কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা তা থেকে কোনও তরল বের হচ্ছে কি না লক্ষ্য করুন।
-
ধাপ ৫- শুয়ে বা দাঁড়িয়ে মাঝের তিনটি আঙুলের ডগার সাহায্যে স্তনে আলতোভাবে চাপ দিন।
-
ধাপ ৬- এই পদ্ধতিতে গোলাকারভাবে পুরো স্তন পরীক্ষা করুন।
-
ধাপ ৭- বগলের অংশেও কোনও গাঁট বা ফোলাভাব আছে কি না পরীক্ষা করুন।
-
ধাপ ৮- কোনও অস্বাভাবিকতা অনুভব করলে যথাযথ স্ক্রিনিং-এর জন্য দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণ পদ্ধতি
স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং নিয়মিত করালে লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেও প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব। স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত হলে উচিত সময়ে চিকিৎসা শুরুর সুযোগ এবং আরোগ্যসম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। স্ক্রিনিং পদ্ধতিগুলি হলো:
ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (CBE)
একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ স্তন ও বগলের এই পরীক্ষা করে থাকেন। এর মাধ্যমে স্তন বা বগলে কোনও গাঁট, ফোলা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
ম্যামোগ্রাফি (Mammography)
এটি স্তনের একটি এক্স-রে ইমেজিং পরীক্ষা। স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলির মধ্যে একটি হলো ম্যামোগ্রাফি, যা শারীরিক পরীক্ষায় অনুভব করা যায় না এমন ছোট পরিবর্তনও সনাক্ত করতে পারে। নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি স্তন ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ২৫% কমায়।
ব্রেস্ট আল্ট্রাসাউন্ড (Breast Ultrasound)
ম্যামোগ্রাফিতে দেখা যাওয়া পিণ্ড বা অস্বাভাবিকতার প্রকৃতি নির্ধারণে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হয়। এটি পিণ্ডটি কঠিন না তরল-ভরা সিস্ট তা বুঝতে সাহায্য করে।
ব্রেস্ট এমআরআই (Breast MRI)
উচ্চ ঝুঁকির মহিলাদের জন্য (যেমন BRCA1/BRCA2 জিন মিউটেশন থাকলে) অথবা যাদের স্তনের টিস্যুর ঘনত্ব বেশি তাদের জন্য এমআরআই সুপারিশ করা হতে পারে। এটি ক্যান্সারে আক্রান্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্থানগুলিকেও শনাক্ত করতে সক্ষম।
কখন স্তন ক্যান্সার পরীক্ষা করাবেন?
স্ক্রিনিং-এর সময়সূচী আপনার বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণগুলির উপর নির্ভর করে।
সাধারণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে:
-
২০-৪০ বছর- প্রতি ৩ বছর পর পর চিকিৎসকের দ্বারা ক্লিনিক্যাল স্তন পরীক্ষা (CBE) করান।
-
৪০ বছর বা তার বেশি- প্রতি বছর ক্লিনিক্যাল স্তন পরীক্ষা (CBE) এবং নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি করানো উচিত। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি বার্ষিক ম্যামোগ্রাফির পরামর্শ দেয়। প্রাথমিক স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণে সাফল্যের হার ৯০%-এরও বেশি, যা জীবন রক্ষাকারী।
উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্রে:
পারিবারিক ইতিহাস, BRCA1/BRCA2 মিউটেশন, বা পূর্বের বায়োপসিতে অস্বাভাবিকতা থাকলে স্ক্রিনিং আরও ঘন ঘন বা কম বয়স থেকে শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসক উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারবেন।
কিছু বিষয় মেনে চলুন
যা করবেন
-
নিয়মিত স্ব-পরীক্ষা- প্রতি মাসে আপনার স্তন পরীক্ষা করুন, অস্বাভাবিকতা পেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
-
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন- সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
-
অ্যালকোহল পরিহার- অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন এড়িয়ে চলুন।
-
চিকিৎসকের পরামর্শ- ঝুঁকির কারণ ও স্ক্রিনিং-এর সময়সূচী সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
যা করবেন না
-
লক্ষণ উপেক্ষা করা- স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা পিণ্ড অনুভব করলে উপেক্ষা করবেন না।
-
ভয় পেয়ে পরীক্ষা এড়ানো- প্রাথমিক শনাক্তকরণে স্তন ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য। ভয় পেয়ে পরীক্ষা এড়িয়ে যাবেন না।
-
ধূমপান- ধূমপান ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই এর প্রতি আসক্তি রাখবেন না।
সারসংক্ষেপ
স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শনাক্তকরণই সফল চিকিৎসার অন্যতম চাবিকাঠি। নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সময়মতো স্তন ক্যান্সার পরীক্ষা দ্রুত স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণ-এর ক্ষেত্রে সাহায্য করে, ফলে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। মণিপাল হসপিটালস-এ আমরা অত্যাধুনিক ডিজিটাল ম্যামোগ্রাফি সহ উন্নত স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং সুবিধা এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করি। আপনি বা আপনার পরিবারে কেও যদি স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ অনুভব করেন বা স্ক্রিনিং করানোর সময় হয়ে থাকে, তাহলে দেরি না করে আজই মণিপাল হসপিটালস রাঙাপানি-এর দক্ষ রেডিওলজি টিম-এর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন। আপনার সুস্থতাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
FAQ's
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও পারিবারিক ইতিহাস, BRCA1 বা BRCA2-এর মতো জিনগত পরিবর্তন, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অ্যালকোহল সেবন এবং ধূমপানের অভ্যাস স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
না, স্তন স্ব-পরীক্ষা কখনোই ম্যামোগ্রাফির বিকল্প হতে পারে না। এটি শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক সচেতনতামূলক ও সতর্কতামূলক পদ্ধতি, যা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দ্রুত লক্ষ্য করতে সাহায্য করে। স্তন ক্যান্সারের নির্ভুল ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের জন্য নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি এবং ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যামোগ্রাফির সময়ে স্তনকে কিছুক্ষণের জন্য সংকুচিত করা হয়, যা কিছু মহিলার জন্য অস্বস্তিকর বা হালকা বেদনাদায়ক হতে পারে। তবে, এটি খুব দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং এর সুবিধা যেকোনও সাময়িক অস্বস্তির চেয়ে বেশি।
হ্যাঁ, ঘন স্তন টিস্যু ম্যামোগ্রাফিতে ছোট পিণ্ড দেখতে বাধা দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে, আপনার চিকিৎসক ম্যামোগ্রাফির পাশাপাশি আল্ট্রাসাউন্ড বা এমআরআই-এর মতো অতিরিক্ত স্ক্রিনিং পদ্ধতির সুপারিশ করতে পারেন।
হ্যাঁ, পুরুষদেরও স্তন ক্যান্সার হতে পারে, যদিও এই রোগটি মহিলাদের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে স্তনে গাঁট, ব্যথা, নিপল থেকে স্রাব, ফোলাভাব বা ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।