বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফুসফুসের ক্যান্সার। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ভারতে মোট ক্যান্সার আক্রান্তের হার ৫.৯% এবং মৃত্যুর হার ৮.১% এবং বেশীর ভাগটাই ফুসফুসের ক্যান্সারের সাথে সম্পর্কিত।
ফুসফুসের ক্যান্সারের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি বা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো প্রাথমিক উপসর্গগুলিকে অনেক সময় সাধারণ সমস্যা ভেবে ভুল করা হয়। তবে এই লক্ষণগুলিকে অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়া সম্ভব। ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণ, ধরন, পর্যায়, কারণ এবং চিকিৎসার বিকল্পসমূহ সম্পর্কে সাবধানতা থাকা জরুরি কারণ সেটিই একমাত্র সঠিক সময়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে সাহায্য করবে।
Synopsis
ফুসফুসের ক্যান্সার কী?
ফুসফুসের ক্যান্সার তখনই হয় যখন ফুসফুসে অস্বাভাবিক কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পায় এবং টিউমার তৈরি করে। এই কোষগুলি আশপাশের টিস্যু বা দূরবর্তী অঙ্গ যেমন মস্তিষ্ক, লিভার, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি বা হাড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বেশিরভাগ ফুসফুসের ক্যান্সারই শ্বাসনালী বা ক্ষুদ্র বায়ুথলিতে উৎপত্তি হয়।

ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণ
ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণগুলি টিউমারের ধরণ এবং পর্যায়ের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে । যখন লক্ষণগুলি দেখা দেয়, তখন এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
সাধারণ লক্ষণ:
-
দীর্ঘস্থায়ী কাশি যা ক্রমশ খারাপ হয় বা সারে না
-
কাশির সাথে রক্ত আসা
-
বুক ব্যথা, বিশেষ করে গভীর শ্বাস নেওয়ার সময় বা কাশির সময়
-
গলার স্বরের পরিবর্তন হওয়া
-
বারবার বুকে ইনফেকশন হওয়া, যেমন নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিস
উন্নত পর্যায়ের লক্ষণগুলি:
-
হাড়ের ব্যথা
-
মুখ, ঘাড় বা বুকের উপরের অংশ ফুলে যাওয়া
-
খাবার গিলতে অসুবিধা হওয়া
-
জন্ডিস, যদি ক্যান্সার যকৃতে ছড়িয়ে পড়ে
-
কাঁধের ব্যথা
দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রমাগত খারাপ হতে থাকা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যাগুলিকে সবসময় চিকিৎসাগতভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রকারভেদ
ফুসফুসের ক্যান্সারকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
-
নন-স্মল সেল লাং ক্যান্সার: এটি প্রায় ৮০-৮৫% ক্ষেত্রে দেখা যায় এবং স্মল সেল ক্যান্সারের তুলনায় ধীরে ছড়ায়। এর উপধরণগুলি হলো অ্যাডেনোকার্সিনোমা, স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা, অ্যাডেনোস্কোয়ামাস কার্সিনোমা এবং লার্জ সেল কার্সিনোমা।
-
স্মল সেল লাং ক্যান্সার: এটি প্রায় ১৫-২০% ক্ষেত্রে ঘটে এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক প্রকৃতির। এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং লিম্ফ নোড বা শরীরের অন্যান্য অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে স্মল সেল কার্সিনোমা অন্যতম।
ফুসফুসের ক্যান্সারের পর্যায়
স্টেজিং বা পর্যায়, ক্যান্সার কতদূর ছড়িয়েছে তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে এবং চিকিৎসা পরিকল্পনার নির্দেশনা দেয়।
-
স্টেজ ০ (কার্সিনোমা ইন সিটু): এই পর্যায়ে ক্যান্সার শুধুমাত্র শ্বাসনালীর আস্তরণে সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাইরে কোথাও ছড়ায় না।
-
স্টেজ ১: ক্যান্সার লিম্ফ নোডের সাথে জড়িত না হয়ে ফুসফুসে সীমাবদ্ধ থাকে।
-
স্টেজ ২: ক্যান্সার ফুসফুসের কাছাকাছি লিম্ফ নোড বা তার অভ্যন্তরীণ টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে।
-
স্টেজ ৩: ক্যান্সার বুকের মাঝখানের লিম্ফ নোড বা বুকের কাছের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
-
স্টেজ ৪: এই পর্যায়ে ক্যান্সার উভয় ফুসফুসে, ফুসফুসের চারপাশে তরল পদার্থ , অথবা মস্তিষ্ক, লিভার বা হাড়ের মতো দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসার ফলাফল অনেক বেশি কার্যকর হয়।
ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ
ফুসফুসের ক্যান্সার কোষের জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশনের কারণে হতে পারে, যা কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিভাজনকে ব্যাহত করে। এই পরিবর্তনগুলি সময়ের সাথে সাথে ডিএনএকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
-
ধূমপান: ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রধানতম কারণ।
-
পরোক্ষ ধূমপান: যেখানে সরাসরি ধূমপান না করলেও আশপাশ থেকে ধোঁয়া নিঃস্বাশের সাথে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
-
দীর্ঘ সময় ধরে দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকা।
-
পেশাগত ঝুঁকি যেমন অ্যাসবেস্টস, রেডন গ্যাস বা ক্ষতিকারক রাসায়নিকের সংস্পর্শ।
-
ফুসফুসের ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস।
-
আগে কখনো বুকে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া হলে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ধূমপান না করা সত্ত্বেও পরিবেশগত এবং বংশগত কারণে ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়া সম্ভব।
চিকিৎসার বিকল্পসমূহ
ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসা নির্ভর করে এর ধরন, পর্যায়, মলিকিউলার প্রোফাইল এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।
-
সার্জারি: এটি সাধারণত প্রাথমিক পর্যায়ে করতে বলা হয়। এতে টিউমারের পাশাপাশি সুস্থ টিস্যুর কিছু অংশও অপসারণ করা হয়। কেমোথেরাপি: এতে ক্যান্সাররোধী ওষুধ ব্যবহার করে ক্যান্সারের কোষগুলি ধ্বংস করা হয় বা তাদের বৃদ্ধি কমিয়ে দেওয়া হয়।
-
রেডিয়েশন থেরাপি: এতে উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন রশ্মি ব্যবহার করে নির্দিষ্টভাবে ক্যান্সারের কোষগুলিকে লক্ষ্য করে ধ্বংস করা হয়।
-
টার্গেটেড থেরাপি: এটি নির্দিষ্ট জেনেটিক মিউটেশন বা মলিকিউলার পাথওয়ের ওপর কাজ করে যা ক্যান্সারের বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে।
-
ইমিউনোথেরাপি: এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে, যাতে তা আরও কার্যকরভাবে ক্যান্সার কোষকে শনাক্ত করতে এবং আক্রমণ করতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে, চিকিৎসকরা সেরা ফলাফল পাওয়ার জন্য এই চিকিৎসাগুলির একটি সমন্বিত পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
সারসংক্ষেপ
ফুসফুসের ক্যান্সার একটি গুরুতর ব্যাধি হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করলে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সার্জারি, টার্গেটেড থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপির মতো উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি, যে কোন ক্যান্সারের চিকিৎসা ফলাফলকে অনেক আশাব্যঞ্জক করে তুলেছে। ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণ চেনা, তামাক বর্জন এবং বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো একটি জীবন রক্ষাকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব। মণিপাল হসপিটালস, রাঙাপানি-তে আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল ক্যান্সারের প্রতিটি পর্যায়ে বিশ্বমানের ডায়াগনস্টিক ও উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আপনার সচেতনতাই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।
FAQ's
প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, মৃদু শ্বাসকষ্ট, বুকে অস্বস্তি, ক্লান্তি বা ব্যাখ্যাতীত ওজন কমে যাওয়া অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে শুরুর দিকে অনেক সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
হ্যাঁ। ধূমপান করেন না যারা তাদেরও ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণগুলির মধ্যে বায়ু দূষণ, রেডন গ্যাসের সংস্পর্শ, পেশাগত ঝুঁকি এবং বংশগত কারণ অন্যতম।
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সার্জারি ও অন্যান্য চিকিৎসার মাধ্যমে এটি সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব। পরবর্তী পর্যায়ে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করা, লক্ষণগুলিকে কমানো এবং উন্নত জীবনযাত্রার সাথে আয়ু বৃদ্ধি করা।
ফুসফুসের ক্যান্সার নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার জন্য একটি বায়োপসি প্রয়োজন। সিটি স্ক্যান (CT scan) বা পেট স্ক্যান (PET scan)-এর মতো ইমেজিং পরীক্ষাগুলি সন্দেহজনক স্থানগুলি সনাক্ত করতে সাহায্য করে, তবে শুধুমাত্র একটি বায়োপসিই, নির্দিষ্ট নিশ্চিতকরণ প্রদান করতে পারে।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা, বিশেষ করে ৫০-৮০ বছর বয়সী দীর্ঘমেয়াদী ধূমপায়ীরা, বার্ষিক কম-ডোজের সিটি স্ক্রিনিং থেকে উপকৃত হতে পারেন। ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণগুলির উপর ভিত্তি করে স্ক্রিনিংয়ের বিষয়ে একজন চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করা উচিত।