আমাদের সহজ ধারণা হল- স্বাস্থ্যকর খাবার খেলেই হজমশক্তি ভালো থাকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সুষম ও সহজ পাচ্য খাদ্য খাওয়া সত্ত্বেও পেট ফাঁপা, অম্বল কিংবা গ্যাস-এর মতো সমস্যা সৃষ্টি হয়ে পেটে অস্বস্তিবোধ হতে থাকে। আসলে, আমাদের হজম প্রক্রিয়া শুধুমাত্র খাবারের ওপর নির্ভরশীল নয়; আরও কিছু বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, যেমন অন্ত্রের সচলতা (Gut motility), এনজাইম-এর কার্যকারিতা, অন্ত্রের মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং খাদ্য থেকে পুষ্টি শোষণ করার ক্ষমতা। যে কোনও সুস্থ মানুষের পক্ষে দিনে ৮ থেকে ১৪ বার, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ২৫ বার পর্যন্তও বায়ুত্যাগ করা স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। তবে এর বেশি হলে বিষয়টি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি পেট ফাঁপা, অতিরিক্ত গ্যাস বা পেট ভারের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন (কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস) ধরে চলতে থাকে, তা হলে একে অন্তর্নিহিত কোনও সমস্যার সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রস্তুত ব্লগে ফ্ল্যাটুলেন্স বা পেট ফাঁপার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
পেট ফাঁপা কী?
পেট ফাঁপা (ফ্ল্যাটুলেন্স) শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। । পাচনতন্ত্রে জমে থাকা বায়ু যখন মলদ্বার দিয়ে নির্গত হয়, তখন তাকে ফ্ল্যাটুলেন্স বলা হয়। হজম প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে আমাদের শরীরে বায়ু বা গ্যাস উৎপন্ন হয়। তবে অতিরিক্ত বায়ু সৃষ্টি হওয়া বা পেট ফাঁপা অনেক সময় শারীরিক অস্বস্তি ও বিব্রত পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। ফলে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন করা সত্ত্বেও পেট ফাঁপার সমস্যা ঠিক না হলে অবিলম্বে একজন গ্যাস্ট্রো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পেট ফাঁপার কারণ কী?
পেট ফাঁপার মূলে সাধারণত খাওয়া-দাওয়ার ধরণ , অন্ত্রের সংবেদনশীলতা কিংবা কোনও শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে প্রধানত যে কারণগুলো দায়ী, তা হল-
-
খাদ্যাভ্যাস ফাইবার-সমৃদ্ধ খাবার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও, হঠাৎ করে বেশি পরিমাণে খেতে শুরু করলে পেটে গ্যাসের উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ডাল, মটরশুঁটি, ব্রকলি এবং বাঁধাকপির মতো সবজি অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া শুরু করলে পেটে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস সৃষ্টি হয়।
-
FODMAP সংবেদনশীলতা: এটি মূলত এক রকমের কার্বোহাইড্রেট (ফাইবার ও শর্করা) যা কারও কারও অন্ত্রে সঠিকভাবে শোষিত না হওয়ার ফলে পেট ফাঁপা ও গ্যাস-এর মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।
-
আর্টিফিশিয়াল সুইটনার: স্বাস্থ্যকর বিকল্প মনে হলেও কৃত্রিম মিষ্টি আপনার পাচনতন্ত্রের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে সুগারফ্রী ক্যান্ডি এবং চিউইং গাম-এ ব্যবহৃত সুগার অ্যালকোহল, যেমন—সরবিটল (Sorbitol) এবং ম্যানিটল (Mannitol), অনেকের অন্ত্রে সঠিকভাবে শোষিত হয় না। এর ফলে এই উপাদানগুলো অন্ত্রে পৌঁছানোর পর ব্যাকটেরিয়াগত প্ৰক্রিয়ার ফলে গ্যাস সৃষ্টি করে পেট ফাঁপাতে পরিণত হয়।
-
অ্যারোফ্যাজিয়া: দ্রুত খাবার খাওয়া , খাওয়ার সময় কথা বলা কিংবা নিয়মিত চিউইং গাম চিবানোর ফলে অজান্তেই অতিরিক্ত বাতাস শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে যা অন্ত্রে বায়ুর প্রভাব ঘটিয়ে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তিকর গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
-
অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা (Gut Bacteria Imbalance): আমাদের পাচনতন্ত্রে থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া হজম প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন কর। যদি কোনও কারণে এই ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন অন্ত্রের কার্যক্ষমতাও বিঘ্নিত হয়। এই অসামঞ্জস্যতার ফলে বায়ুর উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
-
পেট সংক্রান্ত সমস্যা: দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল সমস্যা পেট ফাঁপার জন্য দায়ী হতে পারে, যেমন:
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) ও ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (IBD):
-
সেলিয়াক ডিজিজ
-
কোষ্ঠকাঠিন্য
-
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স (Lactose Intolerance)
- স্মল ইনটেস্টিনাল ব্যাকটেরিয়াল ওভারগ্রোথ (SIBO)
• আলসারেটিভ কোলাইটিস
-
এনজাইমের ঘাটতি: আমাদের পাচন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ছন্দ নির্দিষ্ট কিছু এনজাইমের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে 'ল্যাকটেজ' এনজাইমের অভাব কিংবা অগ্ন্যাশয়ের এনজাইম নিঃসরণে ভারসাম্যহীনতা (Pancreatic Enzyme Insufficiency) হজম ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করার পাশাপাশি অস্বাভাবিক গ্যাস উৎপাদন এবং দীর্ঘস্থায়ী পেট ফাঁপার একটি অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।
-
স্ত্রীরোগজনিত জটিলতা: মহিলাদের ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা বা অতিরিক্ত গ্যাসের সমস্যা কেবল পাচনতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। এন্ডোমেট্রিওসিস, ওভারিয়ান সিস্ট বা হরমোন পরিবর্তনের কারণে অনেক মহিলা মাসিক চক্রের সময়ে পেট ফাঁপা এবং গ্যাসের সমস্যার সম্মুখীন হন।
-
মানসিক চাপ: মস্তিষ্ক এবং অন্ত্রের মধ্যে একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে যার ফলে অতিরিক্ত মানসিক চাপ ‘‘গাট-ব্রেইন কমিউনিকেশন' বা অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে যোগাযোগকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। এর ফলে অন্ত্রের সংবেদনশীলতা এবং স্বাভাবিক গতিশীলতা পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই পরিবর্তনগুলো কেবল গ্যাসের উৎপাদনই বৃদ্ধি করে না, বরং সামান্য গ্যাসকেও অসহনীয় যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে।
পেট ফাঁপার লক্ষণ
পাচনতন্ত্রের প্রক্রিয়ার ফলে সামান্য গ্যাস তৈরী হওয়া একটি স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তবে, মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস তৈরী হলে বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে শুরু করলে, নিচের লক্ষণগুলি দেখা দিতে পারে:
-
সারাদিন বারবার বা অস্বাভাবিকভাবে বায়ু বের হওয়া
-
পেট ফাঁপা বা পেট ফুলে যাওয়া
-
পেটে মোচড় বা ব্যথা
-
পেটের ভিতরে গড়গড় শব্দ হওয়া
-
দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস
বিশেষ কিছু উপসর্গ বিপদের ইঙ্গিত দিতে পারে। নিম্ন লক্ষণগুলি দেখলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত:
-
মলের সঙ্গে রক্ত
-
বাইরের থেকে স্পষ্টভাবে পেট ফোলা বা বড় দেখানো
-
পেটে অনবরত ব্যথা বা খিঁচুনি
-
কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া
-
বারবার বমি হওয়া বা বমি বমি ভাব
পেট ফাঁপার প্রতিকার
পেট ফাঁপার সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা জরুরি। অতিরিক্ত পেট ফাঁপা ও তার কারণে হওয়া কষ্ট কমাতে কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত :
-
যে খাবারগুলো খেলে অতিরিক্ত পেট ফাঁপা বা গ্যাসের সমস্যা হয়, তা চিহ্নিত করা ও ক্রমে সেগুলি খাদ্য তালিকা থেকে সরিয়ে ফেলা
-
একসঙ্গে অতিরিক্ত পরিমাণে ফাইবার না খেয়ে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো
-
ধীরে সুস্থে এবং ভালো করে চিবিয়ে খাওয়া
-
সোডাযুক্ত বা কার্বোনেটেড পানীয় এড়িয়ে চলা
-
চিউইং গাম এবং শক্ত ক্যান্ডি খাওয়ার অভ্যাস কমিয়ে ফেলা
-
পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়া
-
খাদ্যতালিকায় দইয়ের মতো প্রোবায়োটিক উপাদান যোগ করা (তবে এর কার্যকারিতা এক-এক জনের ক্ষেত্রে এক-এক রকম হতে পারে)
-
নিয়মিত ব্যায়াম করা
-
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
এর পাশাপাশি, সমস্যার মূল কারণেকে ভিত্তি করে কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি বা ওষুধও পেট ফাঁপা কমানোর উপায় হতে পারে, যেমন:
-
ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ: সিমথিকোন (Simethicone) যুক্ত ওষুধগুলি পেটের ভিতর সৃষ্টি হওয়া গ্যাস বা বুদবুদগুলি ভেঙে দ্রুত অস্বস্তি থেকে মুক্তি দেয়।
-
ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট: ল্যাকটেজ (Lactase) সাপ্লিমেন্টগুলি তাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স-এর কারণে দুধ বা দুধের তৈরী খাবার খেলে সমস্যা হয়।
-
প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চিকিৎসা: স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে কোনও সমস্যা বা রোগ নির্ণয় হলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ওষুধ খেতে হতে পারে।
-
অস্ত্রোপচার: কিছু ক্ষেত্রে, হজম প্রক্রিয়া সংক্রান্ত কোনও কাঠামোগত অস্বাভাবিকতা থাকলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা ঠিক করে পেট ফাঁপার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
সারসংক্ষেপ
হজম প্রক্রিয়ার ফলে পেটে নির্দিষ্ট পরিমাণে গ্যাস তৈরী হওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে বাড়াবাড়ি বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গগুলিকে অবহেলা করা উচিত নয়। পেট ফাঁপা আসলে কী তা বোঝা, এর কারণগুলিকে চেনা, এবং জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন ও সময় মতো যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে অস্বস্তি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। যদি উপসর্গগুলি চলতেই থাকে, তবে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাহায্যে সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং সঠিক চিকিৎসা সুনিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। মণিপাল হসপিটালস শিলিগুড়ির অভিজ্ঞ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা উন্নত ডায়াগনস্টিক পরিষেবা এবং উচ্চমানের সর্বাঙ্গীন চিকিৎসা প্রদান করেন, যার মূল লক্ষ্য হল হজম স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি এবং জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধি।
FAQ's
সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলির মধ্যে আছে নির্দিষ্ট কিছু খাবারের প্রতি অসহিষ্ণুতা (Food intolerance), FODMAP সংবেদনশীলতা, অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলা এবং অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা। এছাড়াও ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS), কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স-এর মতো শারীরিক সমস্যাগুলিও গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারে।
সতর্ক সংকেতগুলির মধ্যে রয়েছে কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, মলের সঙ্গে রক্ত, পেটে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কিংবা প্রচন্ড ক্লান্তি অথবা কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই জ্বর। এই লক্ষণগুলি হজম প্রক্রিয়ার কোনও গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে, তাই এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ বা মেডিকেল ইভ্যালুয়েশন প্রয়োজন।
হ্যাঁ। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, যেমন—ধীরে ধীরে খাবার খাওয়া, যেসব খাবারে গ্যাস সৃষ্টি হয় সেগুলি এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করার মাধ্যমে পেট ফাঁপার সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এছাড়াও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং খাদ্যতালিকায় প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং কার্বোনেটেড পানীয় বা চিউইং গাম এড়িয়ে চলা পেট ফাঁপা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়ার গতিবৃদ্ধি করে ।
সিমথিকোন (Simethicone)-এর মতো ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধগুলি পেট ফাঁপার সমস্যা থেকে সাময়িক মুক্তি দিতে পারে। তবে যদি উপসর্গগুলি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা বাড়তে থাকে , তা হলে এর মূল কারণ খুঁজে বের করার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা জরুরি।