পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করছেন? পেশীর দুর্বলতা, বমি ভাব, খিদে কমে যাওয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে? সতর্ক হন! এটি আপনার কিডনির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই উপেক্ষা না করে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং কিডনির প্রতি বিশেষভাবে সচেতন থাকুন।
কিডনি রোগ ক্রমশ এক বিশ্বব্যাপী মহামারীতে পরিণত হচ্ছে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা জীবনরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। প্রস্তুত ব্লগে কিডনি ক্ষতির লক্ষণ, কারণ, স্ক্রিনিং-এর গুরুত্ব এবং চিকিৎসার নানাবিধ দিকগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
Synopsis
কিডনি রোগ কী?
কিডনি আমাদের শরীরে প্রাকৃতিক ছাঁকনি বা ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। রক্তে থাকা বর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ, এবং অতিরিক্ত তরলকে অপসারণ করাই এর প্রধান কাজ। এর পাশাপাশি এটি লাল রক্তকণিকা (রেড ব্লাড সেল) উৎপাদনে এবং হাড় সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার কার্যকারিতা কমতে থাকে, যার ফলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতি আকস্মিক হলে তাকে 'অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি' বলা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমাগতভাবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে বলা হয় 'ক্রনিক কিডনি ডিজিজ' (সিকেডি)। দীর্ঘস্থায়ী সিকেডি শেষ পর্যায়ে 'এন্ড স্টেজ কিডনি ডিজিজ'-এ পরিণত হয়ে, যেখানে কিডনি সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে যায়।
কিডনির স্থায়ী ক্ষতি বা কিডনি ফেলিওর রুখতে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কী কী কারণে কিডনির ক্ষতি হয়?
ভাবছেন তো, আপনার কিডনির ক্ষতির কারণ কী হতে পারে? জেনে রাখুন, কিডনির ক্ষতি কিন্তু রাতারাতি হয় না। কিডনির রোগ দীর্ঘ সময় ধরে একটু একটু করে থাবা বসায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ মূল কারণ হয়ে থাকে। এছাড়াও কিছু কিছু বিষয় দায়ী হতে পারে, যেমন:
-
জিনগত সমস্যা
-
অটোইমিউন ডিজিজ
-
সংক্রমণ
-
মূত্রনালীর বাধা
-
কোনও কোনও ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার
কিডনির ক্ষতির প্রাথমিক লক্ষণ:
দীর্ঘ দিন যাবৎ কিডনির ক্ষতির ফলে হৃদরোগ, রক্তস্বল্পতা এবং হাড়ের সমস্যার মতো গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। অথচ, প্রাথমিক পর্যায়ে সিকেডি-এর নির্দিষ্ট কোনও উপসর্গ থাকে না। তাই একে 'সাইলেন্ট কিলার' বা নীরব ঘাতক বলে চিহ্নিত করা হয়। তবে সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার বেশ কিছু ইঙ্গিত দেখা দিতে পারে, যেমন:
-
একটানা ক্লান্তি ও দুর্বলতা
-
পেশীর শক্তি কমে যাওয়া ও টান ধরা
-
বমি হওয়া বা গা-বমি ভাব
-
মুখে ধাতব স্বদের অনুভূতি
-
খিদে হ্রাস পাওয়া ও অকারণ ওজন কমে যাওয়া
-
পা, গোড়ালি, হাত বা মুখে ফোলাভাব
-
সকালে ওঠার পর চোখের চারপাশে ফোলাভাব
-
প্রস্রাবের পরিমাণ, রঙ বা ঘনত্বে পরিবর্তন
-
প্রস্রাবে ফেনা বা রক্ত
-
ত্বকের শুষ্কতা ও চুলকানি
-
মনোসংযগে সমস্যা ও বিভ্রান্তি
-
ঘুমের ব্যাঘাত
-
পায়ে অস্বস্তি
-
অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ
-
হৃদপিণ্ডের চারপাশে তরল জমার ফলে বুকে অস্বস্তি (গুরুতর ক্ষেত্রে)

প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব
শরীরের সম্পূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাদের কিডনি অবিরত কাজ করে চলে। ফলে সামগ্রিকভাবে শরীরের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে কিডনিকে সুস্থ ও কার্যক্ষম রাখা একান্ত জরুরি। তাই কিডনির ক্ষতির প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কিছু ক্ষেত্রে সিকেডি সম্পূর্ণভাবে সারিয়ে তোলা সম্ভব না হলেও, দ্রুত শনাক্তকরণের সাহায্যে রোগের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিডনি সম্পূর্ণভাবে বিকল হয়ে গেলে চিকিৎসার বিকল্পগুলিও সীমিত হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া কোনও বিকল্প থাকে না। তাই, জটিলতা এড়াতে এবং রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, সময় মতো স্ক্রিনিং-এর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত আবশ্যক।
প্রয়োজনীয় কিডনি স্ক্রিনিং
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতির পরীক্ষা নিয়মিত রূপে হওয়া উচিত। সন্দেহজনক কোনও লক্ষণ দেখলে বা রিস্ক ফ্যাক্টর হাই থাকলে আপনার চিকিৎসক নিম্ন পরীক্ষাগুলির পরামর্শ দিতে পারেন:
-
এস্টিমেটেড গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট (eGFR) ব্লাড টেস্ট
-
ক্রিয়েটিনিন ব্লাড টেস্ট
-
ব্লাড ইউরিয়া নাইট্রোজেন (BUN) ব্লাড টেস্ট
-
সিস্টাটিন সি ব্লাড টেস্ট
-
ইউরিন অ্যালবুমিন-টু-ক্রিয়েটিনিন রেশিও (UACR) ব্লাড টেস্ট
-
২৪-আওয়ার ইউরিন প্রোটিন টেস্ট
-
ইউরিন মাইক্রোঅ্যালবুমিন টেস্ট
এছাড়াও কিছু ইমেজিং পরীক্ষা করতে হতে পারে, যেমন:
-
আলট্রাসাউন্ড
-
সিটি স্ক্যান
-
এমআরআই
সারসংক্ষেপ
কিডনি রোগ এমনই এক সমস্যা যা শরীরের ভিতর নীরবে বাড়তে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছানোর পর জানান দেয়। সময় মতো রোগ শনাক্তকরণএবং চিকিৎসা শুরু না হলে এই রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করে মারণরোগে পরিণত হতে পারে। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রাথমিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিডনির ক্ষতির লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপের উপর নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত জল খাওয়া, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ-পত্র না খাওয়া, এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতো বিষয়গুলি মেনে চললে বিপদ ও জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
আপনি বা আপনার কাছের কেও যদি কিডনি সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন বা নির্দিষ্ট কোনও উপসর্গের কারণে কিডনি রোগের আশঙ্কায় ভোগেন, তা হলে আর দেরি না করে মণিপাল হসপিটাল কলকাতার উন্নত নেফ্রোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। কিডনির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রোগ নিরাময়ের জন্য সর্বাঙ্গীন পরিষেবা ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পন্ন এই হাসপাতাল রোগীর সুস্বাস্থ্য ও উন্নত জীবনমানের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
FAQ's
শুরুর দিকে কিডনি রোগে স্পষ্ট কোনও লক্ষণ নাও থাকতে পারে। সময়ের সঙ্গে ক্লান্তি, ফোলাভাব, ফেনাযুক্ত প্রস্রাব, খিদে কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা এবং মনোযোগের অসুবিধা দেখা দিতে পারে। শুরুতেই শনাক্ত করলে স্থায়ী ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। এছাড়াও জেনেটিক সমস্যা, অটোইমিউন রোগ, সংক্রমণ, মূত্রনালীর বাধা এবং কিছু ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
যে সব ব্যক্তি ৬০ বছর বয়স পেরিয়ে গেছেন, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত, স্থুলকায় কিংবা এই রোগের পারিবারিক ইতিহাস বহন করেন, তাদের ক্ষেত্রে কিডনি রোগের ঝুঁকি বেশি। এছাড়া ধূমপান, মদ্যপান ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাও ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
রোগের ধাপ ও কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস-এর ব্যবস্থাপনা, ওষুধ, খাদ্যাভ্যাসের ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত। বাড়াবাড়ি পর্যায়ে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।
হ্যাঁ। অনেক সময় কিডনি ক্ষতির লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই কিডনি রোগ নীরবে বাড়তে থাকে। নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে আগেভাগেই ক্ষতি শনাক্ত করা সম্ভব, যা কিডনির ব্যর্থতা প্রতিরোধে সহায়ক।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অন্তত বছরে একবার কিডনি পরীক্ষা করা উচিত। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও ঘন ঘন পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।